শ্রাবণদিনের শেষ প্রান্তে
পর্ব ১ — শ্রাবণের রাতে ফিরে আসা
শ্রাবণের বৃষ্টি সবসময়ই নীরার কাছে অদ্ভুত মনে হতো।
এই বৃষ্টি শহরের ধুলো মুছে দেয়, গাছের পাতাগুলোকে ধুয়ে চকচকে করে তোলে, অথচ মানুষের মনের পুরোনো দাগগুলোকে যেন আরও স্পষ্ট করে দেয়।
গাড়ির জানালায় কপাল ঠেকিয়ে বসে ছিল নীরা। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। রাস্তার দুপাশের আলো বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে।
ঢাকা থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ।
এতটা পথ আসার পরও তার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোথাও পৌঁছাতে পারছে না।
মায়ের ফোনটা দুপুরে এসেছিল।
—“নীরা, তুই কি আজ আসতে পারবি?”
মায়ের কণ্ঠে অদ্ভুত একটা ক্লান্তি ছিল।
নীরা তখন অফিসে। সামনে জমে থাকা কয়েকটা ফাইল, পাশে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি। সাধারণত মায়ের ফোন সে এড়িয়ে যেত না। কিন্তু গত কয়েক মাসে তাদের কথাবার্তা এমনিতেই প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তবু সেদিন মায়ের কণ্ঠ শুনে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল।
—“কী হয়েছে?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মা বলেছিলেন,
—“কিছু হয়নি। শুধু... তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে।”
এই একটা বাক্যই নীরাকে সব কাজ ফেলে বের করে দিয়েছিল।
এখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
গাড়ির চালক রফিক চাচা রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে বললেন,
—“আর বেশি দূর নাই, মা। এই বৃষ্টি না থাকলে আরও আগেই পৌঁছে যাইতাম।”
নীরা মৃদু হাসল।
—“ঠিক আছে চাচা।”
তারপর আবার বাইরে তাকাল।
এই রাস্তা সে চেনে।
ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কতবার এই পথ দিয়ে এসেছে। তখন রাস্তার দুপাশে এত বাড়িঘর ছিল না। ছিল কেবল ধানখেত, পুকুর আর বিশাল বিশাল গাছ।
বাবা গাড়ি চালাতে চালাতে তাকে গল্প শোনাতেন।
কখনো ভূতের গল্প।
কখনো নিজের শৈশবের কথা।
আর কখনো বলতেন,
“মানুষ যত দূরেই যাক, নীরা, একদিন না একদিন তাকে নিজের শিকড়ের কাছে ফিরতেই হয়।”
তখন কথাটার অর্থ বুঝত না সে।
আজ বুঝতে পারছে।
শুধু বাবাকে ছাড়া।
পুরোনো বাড়িটার সামনে গাড়ি থামতেই নীরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল।
বাড়িটা আগের মতোই আছে।
দোতলার বারান্দায় লোহার রেলিং। উঠোনের একপাশে পুরোনো আমগাছ। সামনের বাগানে শিউলি আর কামিনী।
শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে।
বাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেহরিন রহমান।
নীরা গাড়ি থেকে নামতেই মা ছাতা হাতে এগিয়ে এলেন।
—“এত রাতে আসতে হলো?”
নীরা মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
—“তুমিই তো ডেকেছিলে।”
মেহরিন কিছু বললেন না।
মেয়ের হাত থেকে ব্যাগটা নিতে গিয়ে থেমে গেলেন।
—“তুই খুব শুকিয়ে গেছিস।”
নীরা হেসে ফেলল।
—“এই কথাটা তুমি ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না।”
মায়ের ঠোঁটেও ক্ষীণ হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকল না।
দুজনেই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।
নীরা চারপাশে তাকাল।
দেয়ালে এখনও বাবার ছবিটা ঝুলছে।
ছবিতে বাবা হাসছেন।
সেই পরিচিত হাসি।
যে হাসিটা নীরা গত দশ বছরেও ভুলতে পারেনি।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ছবিটার নিচে রাখা একটা ছোট কাঠের টেবিলের ওপর।
সেখানে বাবার পুরোনো হাতঘড়িটা রাখা।
নীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
—“এটা এখানে কেন?”
মেহরিন পেছন থেকে বললেন,
—“ওটা তো তোর বাবারই।”
—“জানি।”
নীরা ঘড়িটা হাতে তুলে নিল।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে।
রাত ১১টা ১৭ মিনিটে।
নীরার আঙুল কেঁপে উঠল।
বাবার মৃত্যুর সময়ও ছিল রাত ১১টা ১৭ মিনিট।
সে ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।
—“তুমি এটা এতদিন কোথায় রেখেছিলে?”
মেহরিনের মুখের রং বদলে গেল।
—“পুরোনো জিনিস। মনে ছিল না।”
—“মা।”
—“কী?”
—“তুমি মিথ্যা বলছ।”
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল।
মেহরিন চোখ সরিয়ে নিলেন।
—“রুমে যা। অনেক রাত হয়েছে।”
নীরা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে হলো, এই বাড়িতে সে শুধু মায়ের অসুস্থতার কারণে ফিরে আসেনি।
কেউ যেন তাকে এখানে ডেকেছে।
কোনো একটা পুরোনো সত্য।
রাত তখন প্রায় বারোটা।
ঘুম আসছিল না।
নীরা জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছিল।
তার শৈশবের ঘর।
একই কাঠের আলমারি।
একই বুকশেলফ।
একই জানালা।
শুধু সে বদলে গেছে।
টেবিলের ড্রয়ার খুলতে গিয়ে হঠাৎ একটা পুরোনো খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
নীরা ভ্রু কুঁচকে খামটা তুলল।
খামের ওপর কোনো নাম নেই।
শুধু কালো কালিতে লেখা—
“নীরার বাবার জন্য।”
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
খামটা অনেক পুরোনো।
কাগজ হলদেটে হয়ে গেছে।
কাঁপা হাতে সে খাম খুলল।
ভেতরে মাত্র এক পৃষ্ঠা।
সে পড়তে শুরু করল।
«“আপনি যদি এই চিঠি পান, তাহলে বুঝবেন সময় খুব কম। আপনার চারপাশে সবাইকে বিশ্বাস করবেন না। বিশেষ করে—”»
নীরা থেমে গেল।
শেষ লাইনটা যেন ইচ্ছা করেই কেটে দেওয়া হয়েছে।
নিচে একটা তারিখ।
১৭ শ্রাবণ।
তার বাবার মৃত্যুর ঠিক আগের দিন।
নীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এত বছর ধরে সবাই বলে এসেছে—
তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
একটা সাধারণ দুর্ঘটনা।
একটা দুর্ভাগ্যজনক রাত।
কিন্তু এই চিঠি?
কে লিখেছিল?
কেন লিখেছিল?
আর সবচেয়ে বড় কথা—
তার বাবা কি সত্যিই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন?
ঠিক তখনই জানালার বাইরে একটা শব্দ হলো।
নীরা চমকে উঠে দাঁড়াল।
বৃষ্টির মধ্যে উঠোনের গেটের কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
লম্বা, কালো ছাতা হাতে।
মুখটা দেখা যাচ্ছে না।
নীরা পর্দা সরিয়ে আরও কাছে গেল।
লোকটা ধীরে ধীরে ছাতাটা নামাল।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ থেমে গেল নীরার।
এই মুখ সে ভুলে যেতে চেয়েছিল।
কিন্তু পারেনি।
আদিব।
দশ বছর পর।
আদিব বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর যেন নীরার উপস্থিতি টের পেয়ে সরাসরি জানালার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখ মিলল।
কয়েক সেকেন্ড।
কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর আদিব গেট খুলে ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
নীরা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নামতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেল।
—“নীরা।”
সে থেমে গেল।
মেহরিন সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে।
মায়ের চোখে ভয়।
সত্যিকারের ভয়।
—“ওর সঙ্গে দেখা করিস না।”
নীরা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
—“কেন?”
মেহরিন কোনো উত্তর দিলেন না।
নীরা আবার বলল,
—“আদিবের সঙ্গে আমার দেখা করা যাবে না কেন?”
মায়ের চোখে পানি চলে এল।
—“কারণ তোর বাবার মৃত্যুর রাতের সত্যিটা আদিব জানে।”
নীরার হাত থেকে চিঠিটা মেঝেতে পড়ে গেল।
বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি।
আর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল সেই মানুষটি, যাকে নীরা ভেবেছিল তার অতীত।
কিন্তু হয়তো—
আদিবই তার অতীতের সবচেয়ে বড় রহস্য।
#শ্রাবণদিনের_শেষ_প্রান্তে #উপন্যাস